ঢাকা 1:28 pm, Friday, 16 January 2026
সংবাদ শিরোনাম ::

খালেদা জিয়াকে কেন আপসহীন বলা হয়

স্টাফ রিপোর্টার:
  • আপডেট সময় : 07:27:00 am, Wednesday, 31 December 2025 17 বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া তাঁর দৃঢ় সিদ্ধান্তের কারণে আলাদাভাবে চিহ্নিত। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে, যখন প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের অধীনে অংশ নিলেন, খালেদা জিয়া সে পথ গ্রহণ করেননি। তিনি আপসের বদলে প্রতিরোধ ও সংগ্রাম বেছে নেন। ইতিহাস পরে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনব্যাপী বারবার কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়ন হলেও তিনি কখনও আপস করেননি—ফলে তাঁকে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশের পর সাংবাদিকদের সামনে প্রথমবার মুখোমুখি হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর বিএনপি বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। গৃহবধূ খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি দ্রুত অগ্রগতি করেন—১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারপারসন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

নেতৃত্ব গ্রহণের দুই বছরের মধ্যে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, তিনি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রস্তুত এবং স্বৈরশাসনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এরশাদের পতনের আন্দোলন জোরদার করতে তিনি সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বে রাজপথে নামেন। এই সময়ে তাঁর দলের কিছু নেতা এরশাদের দিকে ঝুঁকে যান। খালেদা জিয়া বারবার ছোট সময়ের জন্য আটক হন, পুলিশি হামলার শিকার হন এবং ৮৫ দিন গৃহবন্দী থাকেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আটদলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচদলীয় জোটও সক্রিয় ছিল। শেখ হাসিনাকেও গৃহবন্দী করা হয়। তবুও ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়, যা বিএনপি ‘নীলনকশার’ নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করে।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধের পরপরই খালেদা জিয়াকে রাজধানীর একটি হোটেল থেকে আটক করা হয়। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন যে, খালেদা জিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর আপসহীন চরিত্র। বহুবার গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দী হওয়ার পরও তিনি কখনও আপস করেননি এবং রাজনীতিতে একটি মানদণ্ড স্থাপন করেছেন।

এরশাদের পতনের পর দেশ প্রায় দেড় দশক গণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয়। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে। ওই সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্ত হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দায়ের করা হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচন শেষে শেখ হাসিনা সরকারে আসে। এক-এগারোর সরকারের সময় করা মামলাগুলো বাতিল হলেও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ত্বরান্বিত করা হয়। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় রায়ের পর তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয়। পরে কোভিড মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে ঘরোয়া চিকিৎসার জন্য সাজা স্থগিত করা হয়, যদিও এটি সম্পূর্ণ মুক্তি নয়। ২০২৩ সালে সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া পূর্ণ মুক্তি পান।

রাজনীতি পুনঃস্থাপনের পরও তিনি আপস করেননি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি, কারণ তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকার কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দলের জন্য খরচ বহন করতে হয়েছে। তবে তাঁর দৃঢ়চেতা মনোভাবই তাঁকে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রমাণ করে যে, সব আপস লাভ আনে না এবং সব অনমনীয়তাই পরাজয় নয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

খালেদা জিয়াকে কেন আপসহীন বলা হয়

আপডেট সময় : 07:27:00 am, Wednesday, 31 December 2025

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া তাঁর দৃঢ় সিদ্ধান্তের কারণে আলাদাভাবে চিহ্নিত। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে, যখন প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের অধীনে অংশ নিলেন, খালেদা জিয়া সে পথ গ্রহণ করেননি। তিনি আপসের বদলে প্রতিরোধ ও সংগ্রাম বেছে নেন। ইতিহাস পরে এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনব্যাপী বারবার কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়ন হলেও তিনি কখনও আপস করেননি—ফলে তাঁকে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশের পর সাংবাদিকদের সামনে প্রথমবার মুখোমুখি হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর বিএনপি বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। গৃহবধূ খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি দ্রুত অগ্রগতি করেন—১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারপারসন এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

নেতৃত্ব গ্রহণের দুই বছরের মধ্যে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, তিনি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রস্তুত এবং স্বৈরশাসনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এরশাদের পতনের আন্দোলন জোরদার করতে তিনি সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বে রাজপথে নামেন। এই সময়ে তাঁর দলের কিছু নেতা এরশাদের দিকে ঝুঁকে যান। খালেদা জিয়া বারবার ছোট সময়ের জন্য আটক হন, পুলিশি হামলার শিকার হন এবং ৮৫ দিন গৃহবন্দী থাকেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আটদলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচদলীয় জোটও সক্রিয় ছিল। শেখ হাসিনাকেও গৃহবন্দী করা হয়। তবুও ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়, যা বিএনপি ‘নীলনকশার’ নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করে।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধের পরপরই খালেদা জিয়াকে রাজধানীর একটি হোটেল থেকে আটক করা হয়। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ লিখেছেন যে, খালেদা জিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর আপসহীন চরিত্র। বহুবার গ্রেপ্তার বা গৃহবন্দী হওয়ার পরও তিনি কখনও আপস করেননি এবং রাজনীতিতে একটি মানদণ্ড স্থাপন করেছেন।

এরশাদের পতনের পর দেশ প্রায় দেড় দশক গণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয়। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে। ওই সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্ত হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দায়ের করা হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচন শেষে শেখ হাসিনা সরকারে আসে। এক-এগারোর সরকারের সময় করা মামলাগুলো বাতিল হলেও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ত্বরান্বিত করা হয়। ২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় রায়ের পর তাঁকে কারাগারে নেওয়া হয়। পরে কোভিড মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে ঘরোয়া চিকিৎসার জন্য সাজা স্থগিত করা হয়, যদিও এটি সম্পূর্ণ মুক্তি নয়। ২০২৩ সালে সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া পূর্ণ মুক্তি পান।

রাজনীতি পুনঃস্থাপনের পরও তিনি আপস করেননি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি, কারণ তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকার কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দলের জন্য খরচ বহন করতে হয়েছে। তবে তাঁর দৃঢ়চেতা মনোভাবই তাঁকে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রমাণ করে যে, সব আপস লাভ আনে না এবং সব অনমনীয়তাই পরাজয় নয়।