“সূচনা থেকে সূচনা—মানবিকতা ও স্বাস্থ্যসেবার নতুন দিগন্ত নির্মাণের গল্প”
স্বপ্ন থেকে সেবা: সূচনা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ও সাংবাদিক আল বারু মুস্তাকিম নিবিড়ের মানবতার যাত্রা
- আপডেট সময় : 09:41:41 pm, Thursday, 11 December 2025 454 বার পড়া হয়েছে
বিশেষ ফিচার রিপোর্ট | দৈনিক সবার আগে বাংলাদেশ
ঢাকার ব্যস্ত শহরে প্রতিদিন অসংখ্য সামাজিক সমস্যা, দারিদ্র্য, চিকিৎসা সংকট ও মানবিক চ্যালেঞ্জ আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সমাজের নানা প্রান্তে অসহায় মানুষের কান্না, চিকিৎসা না পেয়ে বেদনার মৃত্যুর খবর, কিংবা মৌলিক অধিকার না পেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম—সব মিলিয়ে মানবতার পথ ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। এমন সমাজ বাস্তবতায় কিছু মানুষ আছেন যারা ব্যক্তিজীবনের শোককে শক্তিতে পরিণত করে অন্যের জন্য পথ তৈরি করেন।
এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সূচনা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন।
প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প: শোক থেকে শক্তিতে রূপান্তর
সূচনা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের জন্ম কোনো সাধারণ ভাবনা থেকে নয়; এটি জন্ম নিয়েছে গভীর আবেগ, ভালোবাসা, এবং এক অমোচনীয় ক্ষতির বুকে।
সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক মানবকণ্ঠের ক্রাইম ও ইনভেস্টিগেশন সেলের প্রধান আল বারু মুস্তাকিম নিবিড়—তার প্রয়াত স্ত্রী সূচনা আক্তার রোকেয়াকে স্মরণে রেখে এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
সূচনা শুধু তার জীবনসঙ্গী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তার স্বপ্ন, তার শক্তি, তার মানবিকতা-বোধ্য করার পথপ্রদর্শক। তার মৃত্যুর পর শোককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে একজন স্বামী সিদ্ধান্ত নেন—“তার নাম বাঁচবে অন্যকে বাঁচানোর মাধ্যমে।”
আর সেই চিন্তা থেকেই জন্ম নিল সূচনা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন।
ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য: দেশের প্রথম আধুনিক টিভি হাসপাতাল স্থাপন
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা, ট্রমা কেয়ার, চোখের চিকিৎসা এবং গবেষণার সমন্বিত কেন্দ্র—এখনো পর্যাপ্ত নয়।
এই ঘাটতি পূরণে ফাউন্ডেশনটির প্রধান ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য হলো—
একটি আধুনিক “টিভি হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা করা
(Full Form: Trauma, Vision & Integrated Health Facility)
যেখানে থাকবে—
জরুরি ট্রমা কেয়ার
উন্নত দৃষ্টিচিকিৎসা
সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা
বিশেষ গবেষণা সেল
দরিদ্র রোগীদের জন্য বিশেষায়িত ফ্রি বা অতি কমমূল্যের চিকিৎসা
এই হাসপাতালটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম মানবিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হবে—এমনটাই আশা করছেন প্রতিষ্ঠাতা।
আল বারু মুস্তাকিম নিবিড়: সাংবাদিকতা থেকে সমাজসেবার পথে
সিনিয়র সাংবাদিক আল বারু মুস্তাকিম নিবিড়ের পেশাগত জীবনও কম নাটকীয় নয়।
করপশন, অপরাধ, রাষ্ট্রীয় অনিয়ম, সামাজিক অবক্ষয়—সবকিছুর বিপক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে আসছেন।
দৈনিক মানবকণ্ঠের ক্রাইম ও ইনভেস্টিগেশন সেলের প্রধান হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কাজ করেছেন।
তার রিপোর্টিংয়ে—
দুর্নীতি উন্মোচন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার অনিয়ম তুলে ধরা
সামাজিক অপরাধ প্রবণতা বিশ্লেষণ
মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ক অনুসন্ধান
এসব বিষয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
কিন্তু সাংবাদিকতার ব্যস্ততা ও কঠিন বাস্তবতার মাঝে তার মানবিকতা কখনো হারিয়ে যায়নি।
প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতিকে ধারণ করে সমাজসেবায় বড় পরিসরে কাজ করার যে সংকল্প তিনি নিয়েছেন—এটি ব্যক্তিগত সাহস, ভালোবাসা এবং মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
মানবিক কার্যক্রম: সূচনার নামে সেবার আলো
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফাউন্ডেশনটি বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
শীতার্তদের সহায়তা
সম্প্রতি গেন্ডারিয়া এলাকার বিপিন রায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ জন শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করেছে ফাউন্ডেশনটি।
শীতের মৌসুমে এই উদ্যোগ অসহায় মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।
খাদ্যসামগ্রী বিতরণ
পরিবার–ভিত্তিক খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম চলছে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন এলাকায়ও।
শিক্ষা সহায়তা ও সচেতনতা
বঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বিভিন্ন প্রকার সহায়তা, সচেতনতা ক্যাম্প ও স্টেশনারি বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ উদ্যোগ
টিভি হাসপাতালের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ছোট পরিসরে মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ বিতরণ ও চিকিৎসা সহায়তা কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: একের পর এক নতুন উদ্যোগ
ফাউন্ডেশনটি শুধু সামাজিক সেবা নয়—একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে—
পূর্ণাঙ্গ টিভি হাসপাতাল নির্মাণ
মোবাইল মেডিকেল সার্ভিস
নারী ও শিশু সুরক্ষা প্রোগ্রাম
রক্তদাতা নেটওয়ার্ক
মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি
দুর্যোগকালীন দ্রুত সহায়তা ইউনিট
স্বাস্থ্য ও সামাজিক গবেষণা সেল
যুব স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন
ফাউন্ডেশনটি বিশ্বাস করে—“মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলে একটি সুস্থ সমাজ তৈরি হয়।
শেষ কথা: সূচনা থেকে শুরু—মানবতার পথে এগিয়ে চলা
একজন মানুষের মৃত্যু অনেককেই ভেঙে দেয়। কিন্তু সূচনা আক্তার রোকেয়ার মৃত্যুর পর তার স্বামী আল বারু মুস্তাকিম নিবিড় সে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন—ব্যক্তিগত বেদনা থেকেও সমাজের জন্য মহৎ উদ্যোগ তৈরি হতে পারে।
আজ সূচনা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন প্রমাণ করছে—
“যে আলো নিভে গেছে, সেই আলোর নামেই নতুন আলো জ্বালানো যায়।”
যদি এই পথচলা সফল হয়, তবে একদিন টিভি হাসপাতালসহ সব উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পাবে—আর সূচনার নাম হয়ে উঠবে হাজারো মানুষের আশ্রয়, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।









