ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ: ভূমিকম্প-সহনশীল স্থাপনা ও আধুনিক মহাসড়ক উন্নয়নে ২৩ বছরের অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর অবদান
ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক মহাসড়ক প্রকৌশলের রূপকার: ড. আহাদ উল্লাহ
- আপডেট সময় : 08:21:02 am, Thursday, 23 April 2026 107 বার পড়া হয়েছে
ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো ও মহাসড়ক প্রকৌশলে পথিকৃৎ ড. আহাদ উল্লাহ: এক দেশপ্রেমিক প্রকৌশলীর জয়যাত্রা
বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের নেপথ্যে যারা আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি উৎকর্ষ নিশ্চিত করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ। গত ২৩ বছরের দীর্ঘ পেশাজীবনে তিনি কেবল পাঠ্যপুস্তকের তাত্ত্বিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বিদেশের বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে নিজ দেশের ভূ-তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করেছেন। ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে আধুনিক মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা—সর্বত্রই তার মেধা ও দেশপ্রেমের ছাপ সুস্পষ্ট।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে অগ্রণী ভূমিকা
পেশাগত জীবনের শুরুতেই ড. আহাদ উল্লাহ বাংলাদেশের নগর অবকাঠামোর এক বড় দুর্বলতা নিয়ে কাজ শুরু করেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) গবেষণাকালীন তিনি বহুতল ভবনের ‘সফট স্টোরি’ বা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত খোলা নিচতলার ঝুঁকি চিহ্নিত করেন। তার গবেষণার প্রধান দুটি দিক ছিল:
সফট স্টোরি রিসার্চ: ভূমিকম্পের সময় ভবনের সবচেয়ে দুর্বল অংশটি কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তার দিকনির্দেশনা প্রদান।
ইট-পাথরের গাথুনির সহনক্ষমতা:‘শেয়ার অ্যান্ড টেনসাইল স্ট্রেন্থ’ নিয়ে তার গবেষণা ভবনগুলোকে ভূমিকম্পের সময় পার্শ্বচাপ সহ্য করতে সক্ষম করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে।
তার এই গবেষণালব্ধ ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় ভবন নির্মাণে আজও গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে
পরিবহন প্রকৌশল ও অধ্যাপক ড. শামসুল হকের সান্নিধ্য
২০১২ সালে বুয়েটে পরিবহন প্রকৌশলে মাস্টার্স করার সময় তিনি প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হকের তত্ত্বাবধানে কাজ করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের মহাসড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে নিবিড় গবেষণা করেন। এ দেশের আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানের চাপ সামলাতে দেশীয় কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পথ দেখান তিনি। এই একাগ্রতাই তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যায়।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটি ও ঐতিহাসিক পিএইচডি
২০১৩ সালে ড. আহাদ উল্লাহ অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতনামা কার্টিন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি শুরু করেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিদেশের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করলেও, তিনি বেছে নেন বাংলাদেশের মহাসড়ক ব্যবস্থাকে।
ঐতিহাসিক অর্জন:স্বাধীনতার পর তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সরাসরি বাংলাদেশের মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা ও স্থায়িত্ব নিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
বিশ্ব স্বীকৃতি:তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছয়টি উচ্চমানের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
মেধা পাচার রোধ ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত
২০১৭ সালে পিএইচডি শেষে ড. আহাদ উল্লাহর সামনে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার ও বড় ক্যারিয়ার গড়ার হাতছানি ছিল। কিন্তু ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের স্রোতে গা না ভাসিয়ে তিনি ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে। তার মতে, উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে নিজ দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার মধ্যে। তার এই সিদ্ধান্ত বর্তমান প্রজন্মের তরুণ প্রকৌশলীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
মেগা প্রকল্পে অবদান ও কারিগরি নেতৃত্ব
বিগত দুই দশকে ড. আহাদ উল্লাহ দেশের যোগাযোগ খাতের যুগান্তকারী সব পরিবর্তনের সারথী হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে:
সাসেক সড়ক সংযোগ (ঢাকা-টাঙ্গাইল ৪-লেন): উত্তরবঙ্গের এই লাইফলাইনের স্থায়িত্ব নিশ্চিতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
ইস্টার্ন ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (জাইকা): জাপানি কারিগরি মান বজায় রেখে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নির্মাণ তদারকি করেছেন তিনি।
চট্টগ্রাম মহাসড়কের আয়ুষ্কাল বাড়াতে তিনি আধুনিক বিটুমিন বা ‘মডিফাইড অ্যাসফল্ট’ ব্যবহারের কারিগরি দিক বাস্তবায়ন করেন।
আমিন বাজার সেতু:রাজধানীর প্রধান প্রবেশপথ আমিন বাজার সেতুর নির্মাণ কাজেও তার মেধা ও অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে।
স্মার্ট যোগাযোগের স্বপ্নদ্রষ্টা
ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ কেবল একজন প্রকৌশলী নন, বরং আধুনিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার এক কারিগর। ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী মহাসড়ক নির্মাণ—তার ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা আজ দেশের অমূল্য সম্পদ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ড. আহাদ উল্লাহর মতো মেধাবী ও দেশপ্রেমিক প্রকৌশলীদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ও এর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।








