অবৈধ আয়ে দেশ-বিদেশে বিত্তের পাহাড়: প্রজাতন্ত্রের প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও চরম নৈতিক স্খলনের অভিযোগ
প্রকৌশলী শফিকুলের অবৈধ সাম্রাজ্য: নজরদারিতে দুদক
- আপডেট সময় : 07:23:57 am, Saturday, 9 May 2026 73 বার পড়া হয়েছে
সওজ প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের আয়বহির্ভূত সাম্রাজ্য, দুদকের নজরদারি
দূর্নীতি অনিয়ম ও সওজ বিধিমালার চরম অবমাননা
দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। বর্তমানে পানগুচি সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার মেনুপুলেশন, প্রকল্পের নকশা ডেভিয়েশন নজিরবিহীন অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। কেবল দেশেই নয়, তার অবৈধ আয়ের জাল বিস্তৃত হয়েছে সাত সমুদ্র পাড়েও; তার এক সন্তান বর্তমানে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং সেখানে তার উচ্চবিলাসী জীবনযাপন নিয়ে উঠছে নানা আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন।
ম্যানেজার ও কেয়ারটেকারের বিস্ফোরক জবানবন্দি
শফিকুল ইসলামের এই গগনচুম্বী বিত্ত-বৈভবের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার আবু ইসহাক ও মোহাম্মদপুরের বাসভবনের ম্যানেজার। কেয়ারটেকার আবু ইসহাক অকপটে স্বীকার করেন যে, শফিকুল ইসলামের অঢেল সম্পত্তির পাহাড় রয়েছে এবং তার জীবনযাত্রার ধরণ একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার আয়ের সাথে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ভবন ম্যানেজারের দেওয়া তথ্যমতে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের ১০/৪ নম্বর ভবনের যে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটিতে তিনি থাকেন, তার নম্বর ‘৬সি’ (6C), যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। কেবল এই ফ্ল্যাটের মালিকই নন, তিনি ওই পুরো ভবন সোসাইটির প্রতাপশালী সভাপতিও বটে। ম্যানেজারের আরও দাবি, লালমাটিয়ার বি-ব্লকে পানির পাম্প ও মসজিদের সংলগ্ন এলাকায় শফিকুল ইসলামের আরও একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। ওই বাড়ির শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসহাক অবাক বিস্ময়ে জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন, তা নিয়ে পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনা চলছে।
রাজশাহীতে ভূ-সম্পত্তির একচ্ছত্র রাজত্ব
শফিকুল ইসলামের আদি নিবাস রাজশাহী জেলায়, যেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন ভূ-সম্পত্তির এক মহাসাগ্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে:
বিশাল কৃষি জমি: রাজশাহীর গ্রামে শফিকুল ইসলামের নিজের কেনা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বিঘা জমি রয়েছে।
শ্বশুরবাড়ির এলাকা: তার শ্বশুরবাড়ি এলাকাতেও রয়েছে আরও প্রায় ৩২ বিঘা জমি।
রাজশাহীতে অন্যান্য জমি: শহরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তার নামে আরও প্রচুর পরিমাণ জমি কেনা আছে।
সম্পদ মূল্যায়ন: গ্রামের বাড়ি ও তৎসংলগ্ন জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তথ্য মিলেছে।
ঢাকায় ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য সম্পদ:
রাজউক পূর্বাচল প্লট: পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৪ নম্বর সেক্টরের ৩০৬ নম্বর সড়কে ৫ নম্বর প্লটটি তিনি নিজের নামে ক্রয় করেছেন।
পীরেরবাগের ফ্ল্যাট: রাজধানীর ২৯২, পীরেরবাগে তার আরও একটি সুসজ্জিত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে।
বেনামে বিনিয়োগ: নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতে তিনি স্ত্রী ফাতেমা শারমিন মুন এবং নিকটাত্মীয়দের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ বেনামে ক্রয় করেছেন। সিরাজগঞ্জ সদরের খোকশাবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার এই সম্পদের বিস্তৃতি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও আইনি ব্যাখ্যা
প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের এই অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন নিয়ে টিআইবি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা কঠোর মন্তব্য করেছেন।
প্রশাসনিক বিশ্লেষক ড. এম. আমানুল্লাহ বলেন,
“একজন সরকারি প্রকৌশলীর বেতন কাঠামো সবার জানা। যখন একজন কর্মকর্তার জীবনযাপন এবং স্থাবর সম্পদের পরিমাণ তার বৈধ আয়ের তুলনায় হাজার গুণ বেশি হয়, তখন সেটি সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমতুল্য। এটি প্রমাণ করে যে প্রকল্পের টেন্ডার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরণের হরিলুট হয়েছে।”
দুর্নীতি বিরোধী বিশ্লেষকদের মতে, শফিকুল ইসলাম মূলত ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর একাধিক ধারা (বিশেষ করে বিধি ১১, ১২ ও ১৭) সরাসরি লঙ্ঘন করেছেন। বিধি অনুযায়ী, আয়ের উৎসের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পত্তি রাখা কেবল শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং এটি একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া, এক সন্তানের বিদেশে স্থায়ী বসবাস ও সেখানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ‘মানি লন্ডারিং’ আইনের আওতায় কঠোর তদন্তের দাবি রাখে।
সাংবাদিক পরিচয়ে রণমূর্তি ধারণ
প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই ও বক্তব্য গ্রহণের জন্য সাংবাদিক পরিচয়ে মো. শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চরম অভব্যতা প্রদর্শন করেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা শুনেই তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সাংবাদিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে অত্যন্ত অশালীন ও অশ্রাব্য ভাষায় মন্তব্য শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন ‘রাস্তার লোকজনের’ মতো আচরণ তার নৈতিক স্খলনকেই স্পষ্ট করে।
প্রজাতন্ত্রের একজন প্রকৌশলীর হাতে পানগুচি সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পের দায়িত্ব থাকলেও তিনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের পকেট ভারী করতে। বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায় প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে, দুদকের বিভিন্ন স্তরের নজরদারিতে রয়েছেন তিনি। কেয়ারটেকার ও ম্যানেজারের জবানবন্দি, এলাকাবাসীর বিস্ময় এবং তার অসভ্য আচরণ—সবই এক ভয়াবহ দুর্নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচিত দ্রুত এই ‘কালো টাকার মহাসাগর’ বাজেয়াপ্ত করে তাকে আইনের আওতায় আনা।








