সড়ক ও জনপথ বিভাগের সম্পত্তি দখল ও টেন্ডার-ঘুষ বাণিজ্য!
প্রোকৌঃ রিতেশ শোনেন না কারো কথা, লাগামহীন দুর্নীতির মচ্ছবে মশগুল
- আপডেট সময় : 09:10:33 am, Wednesday, 26 November 2025 1307 বার পড়া হয়েছে
বেপরোয়া নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার গডফাদার ফ্যাসিবাদের দোসর প্রধান প্রকৌশলী মইনুল হাসানকে করা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদ
তারেক রহমান তকি:
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়া যেন এখন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের পিএস-এর ভাগ্নি জামাই হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে এই কর্মকর্তা ঢাকা সড়ক বিভাগকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। তিনি কেবল টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নন, সওজ-এর কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখলদারদের হাতে তুলে দিয়ে ‘মামা-ভাগ্নে সিন্ডিকেট’ এর সঙ্গে ভাগ বসাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
🏛️ সড়ক ও জনপথ বিভাগের সম্পত্তি বেহাত: দখলদারদের সাথে রিতেশের লিয়াজোঁ
ঢাকা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে রিতেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ হলো, তিনি সরাসরি দখলদারদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে সওজ-এর মূল্যবান সম্পত্তি বেহাত হতে সাহায্য করছেন। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সওজ-এর আওতাধীন বহু স্থাপনা, ডরমেটরি এবং জমি এখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কর্মীদের অবৈধ দখলে।
বাবুবাজার ব্রিজের নিচে বাজার: পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজের নিচের বিশাল এলাকা সওজ-এর সম্পত্তি। কিন্তু সেখানে অস্থায়ী বাজারের নামে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। এই বাজার থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়, যার একটি বড় অংশ নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার পকেটে যায় বলে অভিযোগ।
মহাখালীর ডরমেটরি ও সম্পত্তি: মহাখালী এলাকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন ডরমেটরি এবং মূল্যবান খালি সম্পত্তি রয়েছে। অভিযোগ, এই সম্পত্তিগুলোও রিতেশ বড়ুয়ার ছত্রছায়ায় কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ভোগদখল করছে এবং এর বিনিময়ে রিতেশকে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়া হচ্ছে।
স্থান ভেদে চাঁদাবাজি: ঢাকা সড়ক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলের মূল্যবান স্থাবর সম্পত্তি থেকেও অনুরূপভাবে অবৈধ উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা রিতেশ বড়ুয়ার “রাম রাজত্ব” চলার মূল শক্তি।
💰 টেন্ডার, কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্য: অবৈধ অর্থের পাহাড়
রিতেশ বড়ুয়া ঢাকা জোনে পদায়নের পর থেকেই ঘুষ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছেন বলে জানা যায়।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ: অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা সড়ক বিভাগের অধীনে থাকা রাস্তা মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন নির্মাণকাজের টেন্ডারগুলোতে বিশেষ ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। এর বিনিময়ে তিনি টেন্ডারের মোট মূল্যের একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে গ্রহণ করেন।
কমিশন বাণিজ্য: প্রতিটি বিল পাস, প্রকল্পের অনুমোদন এবং ঠিকাদারদের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে তাঁকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। যারা ঘুষ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তাদের কাজ আটকে দেওয়া হয় কিংবা নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়।
পূর্বের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানের অধীনে কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন রিতেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে সেতুতে লোহার পাতের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের মতো গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। দেশব্যাপী এই ঘটনা ব্যাপক সমালোচিত হলেও তথাকথিত ‘সজ্জন’ মঈনুল হাসান তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। এর পুরস্কার স্বরূপ, আওয়ামী সরকারের পতনের পরেও মঈনের একক হস্তক্ষেপে তাকে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সড়ক বিভাগে পদায়ন করা হয়।
🏦 সন্দেহজনক লেনদেন ও বিলাসবহুল জীবনযাপন
বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) সূত্রে জানা যায়, রিতেশ বড়ুয়ার ব্যাংকের লেনদেন সন্দেহজনক এবং তার আয়ের উৎসের সঙ্গে এই লেনদেনের কোনো মিল নেই। তিনি ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি অর্জন করেছেন।
রাজধানীতে সম্পত্তি: রাজধানীর শ্যামলী ও মোহাম্মদপুর এলাকায় তার আলিশান ফ্ল্যাট বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে।
উত্তরায় বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স: ঢাকার উত্তরা এলাকায় স্ত্রী দেবো কি বড়ুয়ার নামে তিনি একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও তথ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, তার স্ত্রীর নামে ঢাকার অন্তত ১৮ টি সঞ্চয়পত্র রয়েছে, যার অনেক মূল্য ৩৫ কোটি টাকা।
এক সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এত অল্প সময়ে এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং একাধিক সম্পত্তির মালিক হওয়া তার লাগামহীন দুর্নীতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
👤 বিশেষজ্ঞের মন্তব্য: “তদন্ত জরুরি, নতুবা জনগণের সম্পদ রক্ষা হবে না”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক এই প্রতিবেদককে বলেন:
💬 “সরকারি দপ্তরে এই ধরনের বেপরোয়া দুর্নীতি মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে যেখানে জনগণের নিরাপত্তা ও দেশের অবকাঠামো জড়িত। সওজ-এর সম্পত্তি দখল হতে দেওয়া মানে রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন। নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। যদি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে এই রাম রাজত্ব থামানো যাবে না এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকা ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
🛑 শেষ কথা
সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা রিতেশ বড়ুয়ার লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সদ্য পতন হওয়া ‘কাদের চক্র’-এর আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের এমন পুনর্বাসন সংস্কারের নামে উল্টো আওয়ামী পন্থীদের পুনর্বাসনকে আরও শক্তিশালী করছে। ঢাকা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জোনে রিতেশ বড়ুয়ার এই রাম রাজত্ব চলতে থাকলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অবশিষ্ট সম্পত্তিও দখল হয়ে যাবে এবং নির্মাণ কাজে দুর্নীতির ফলে দেশের অবকাঠামোগত মান আরও খারাপের দিকে যাবে।
কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ এবং রিতেশ বড়ুয়ার সকল দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এখন সময়ের দাবি।






