মুক্তিযুদ্ধকে জয়ী হতে হবে
- আপডেট সময় : 02:56:22 am, Tuesday, 16 December 2025 431 বার পড়া হয়েছে
মুক্তিযুদ্ধকে এখনও জিততে হবে
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছিল বিজয়ের মধ্য দিয়ে, কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই সেই বিজয় পূর্ণতা পায়নি। ১৯৭১–এর ডিসেম্বরে যুদ্ধ জয়ের উল্লাস থাকলেও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না। ফলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছড়িয়ে পড়েন, কেউ কেউ হারিয়ে যান, কেউ আবার ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হন।
যুদ্ধশেষে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন—যুদ্ধ জেতা কি যথেষ্ট? অস্ত্রের লড়াই জিতলেও কি শাসনব্যবস্থা, প্রশাসন আর বৈষম্যের কাঠামো বদলানো গেছে? বাস্তবতা হলো, পুরোনো আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতার বলয় খুব দ্রুতই আবার জায়গা করে নেয়। যুদ্ধের মাঠে যারা সামনে ছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জায়গায় তারা থাকেননি।
এই অভিজ্ঞতা শুধু ১৯৭১–এর নয়। ১৯৯০ কিংবা ২০২৪—প্রতিটি বড় গণ–অভ্যুত্থানের পর একই চিত্র ফিরে আসে। মানুষ রাস্তায় নামে বৈষম্য কমানোর আশায়, ন্যায়বিচার আর মর্যাদার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু আন্দোলনের পর সেই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের কার্যকর কর্মসূচি আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনুপস্থিত থাকে। ফলে বিজয় এসেও তা সাধারণ মানুষের জীবনে খুব কমই প্রতিফলিত হয়।
স্বৈরশাসনের সহযোগীরা বারবার জবাবদিহির বাইরে থেকে গেছে। নির্বাচন, প্রশাসন ও অর্থনীতিতে একই গোষ্ঠীর প্রভাব রয়ে গেছে। এতে যোদ্ধা আর বিরোধীরা একাকার হয়ে যায়, আর দায় চাপানো হয় আন্দোলনকারীদের ওপরই। এটা শুধু ব্যর্থতা নয়—এটা বিজয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
সাম্প্রতিক সময়েও আমরা দেখেছি, সংস্কারের দাবি ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। ১৯৭১ আর ২০২৪–কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক পরিসরে বিভাজন ছড়ানো হয়েছে। এটি ছিল পরিকল্পিত রাজনৈতিক–আদর্শিক আক্রমণ, যার লক্ষ্য ছিল গণআন্দোলনের শক্তিকে বিভ্রান্ত করা।
অথচ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক গণ–আন্দোলনের মূল চেতনায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা ছিল না। বরং একাত্তরের সাহস, ঐক্য আর আত্মত্যাগের চেতনাই মানুষকে আবার পথে নামতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তখন যেমন প্রশ্ন ছিল—দেশের সম্পদ কার জন্য—আজও সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আজ বাংলাদেশে সম্পদ বাড়ছে, কিন্তু তার সুষম বণ্টন হচ্ছে না। দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে, আর একই সঙ্গে অল্প কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হচ্ছে। এই বৈষম্যই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট। ইতিহাস বলে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে টিকতে পারে না।
কিন্তু এই বাস্তবতা মোকাবিলার বদলে অনেক রাজনৈতিক শক্তি পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনকে সামনে আনছে—ধর্ম, সংস্কৃতি, নারী–পুরুষ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবকিছুতে মেরুকরণ। এতে সংগঠন শক্তিশালী হয়, কিন্তু মানুষের জীবন বদলায় না। দারিদ্র্য, বৈষম্য আর ক্ষমতার জবাবদিহি—এই মূল প্রশ্নগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
বারবার দেখা গেছে, সংগ্রাম শেষ হলে যোদ্ধাদের সরিয়ে দিয়ে পুরোনো কাঠামো টিকিয়ে রাখা হয়। ১৯৭২–এ যেমন হয়েছিল, ২০২৪–এর পরও তেমন আশঙ্কা স্পষ্ট। যারা জীবন দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে, তারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের টেবিলে জায়গা পায় না।
তবু মুক্তিযোদ্ধাদের থেমে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি পরাজয় থেকেই শিক্ষা নিয়ে আবার সংগঠিত হতে হবে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য এখনও অপূর্ণ।
মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ী হতে হবে—ইতিহাসকে পুঁজি করে ব্যবসার জন্য নয়, ভিন্নমত দমনের জন্য নয়, কিংবা বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নত করার জন্য নয়। জয়ী হতে হবে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য।
১৬ ডিসেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি শত শত বছরের লড়াই, আশা আর আত্মত্যাগের প্রতীক। যেমন প্রতীক ১৯৯০–এর ডিসেম্বর, তেমনি ২০২৪–এর জুলাইও। এই স্মৃতিগুলো একসঙ্গে মিশে বাংলাদেশের পথ দেখায়।
আজকের মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে স্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে—অন্যায্য রাষ্ট্রকাঠামো বদলানো, বৈষম্য কমানো, বহুত্ববাদী রাজনীতি গড়া, ধর্ম ও পরিচয়ের নামে ফ্যাসিবাদ রুখে দেওয়া, মানুষের জীবন–জীবিকা ও প্রকৃতি রক্ষা করা, এবং সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা।
এই লক্ষ্য অর্জনে নতুন করে গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। অতীতে কেউ পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশ বারবার প্রমাণ করেছে—এই লক্ষ্য থেকে সে সরে যায়নি।
এই অটল থাকাটাই বাংলাদেশের আসল শক্তি। আর সেই শক্তির ওপর ভর করেই মুক্তিযুদ্ধকে আবার, নতুন করে, জয়ী হতে হবে।









