বদলে যায় সময়, থেকে যায় আর্তনাদ
- আপডেট সময় : 07:46:59 am, Friday, 10 October 2025 620 বার পড়া হয়েছে
পুরোনো প্রক্রিয়ায় নতুন দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন নিয়ে ওঠা আলোচনা ও সমালোচনার বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন—
“আজ টেলিভিশন অনুমোদন নিয়ে যে হাহাকার দেখা যাচ্ছে, তা আসলে পুরোনো ব্যবস্থার অংশ এবং তাদেরই প্রতিক্রিয়া, যারা মনে করে নতুন কেউ বা নতুন মুখ যেন এ অঙ্গনে না আসে। আমরা তাদের এই উদ্বেগ ভালোভাবেই বুঝি।”
তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজিত ‘গণমাধ্যমে জুলাই ও তারপর’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
“নতুন মিডিয়া মানে নতুন কণ্ঠস্বর”
নতুন টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন—
“আমি যদি সরকারে এক দিনও থাকি, তবুও চেষ্টা করব নতুন গণমাধ্যমের পথ খুলে দিতে। আমরা যেহেতু ফ্যাসিবাদী গণমাধ্যম বন্ধ করিনি, তাই নতুনদের জন্যও জায়গা তৈরি করব। নতুন মিডিয়া নতুন মুখ আনবে, নতুন বয়ান আনবে, নতুন বক্তব্য আনবে—এবং আমরা সহিংসতার পথে না গিয়ে বক্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্যের লড়াইয়ে নামব। চিন্তার লড়াইয়েই আমরা জয়ী হব—এটা একদম স্পষ্ট কথা, এখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই।”
“হস্তক্ষেপ নয়, দায়িত্বহীনতা আছে”
তিনি বলেন—
“সরকার গণমাধ্যমে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না, তবে আমি দায়িত্ববোধ খুব একটা দেখছি না। বরং একই ধরণের কিছু বয়ান বারবার সামনে আনা হচ্ছে। যে পুরোনো বয়ানগুলো হাসিনাকে এত দিন ক্ষমতায় রেখেছিল, সেই বয়ানগুলোই আবার ফিরে আসছে। পুরোনো মুখগুলোও দেশে–বিদেশে নতুন নতুন নামে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। আমরা সবই লক্ষ্য করছি।”
মাহফুজ আলম আরও জানান, গত ১৫ বছরে কীভাবে সাংবাদিকতা ব্যবহার করে মানুষকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়েছে, গুম–খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো কীভাবে আড়াল করা হয়েছে—এসব নিয়ে জাতিসংঘের কাছে একটি স্বাধীন তদন্তের অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছিল।
জাতিসংঘ পরামর্শ দেয় বিষয়টি ইউনেসকোর সঙ্গে আলোচনা করার। পরে ইউনেসকো জানায়, তারা তদন্ত নয়, বরং গণমাধ্যমের জন্য একটি কোড অব কন্ডাক্ট (নীতিমালা) তৈরিতে সহায়তা করতে চায়।
“স্বাধীন তদন্ত না হওয়াটা একটি গভীর দাগ রেখে যাবে,” বলেন মাহফুজ আলম।
“যেসব গণমাধ্যমের মালিক বা সম্পাদকরা এই প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন, তাঁদের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং জবাবদিহি করা উচিত।”
“আরও সংকট সামনে আসছে”
২০২৪ সালের আগস্টে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘মবোক্রেসি’ বিষয়ক একটি ফেসবুক পোস্টের কথা উল্লেখ করে মাহফুজ আলম বলেন—
“আজ বাংলাদেশ সেই ‘মবোক্রেসি’-এর ভেতরেই ঢুকে গেছে। এটা আমাদের ব্যর্থতা, আমি স্বীকার করছি। আমরা সবকিছু সামাল দিতে পারিনি। একসময় যেভাবে নানা শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণের মানুষ একসঙ্গে আমাদের পাশে ছিল, সেই ঐক্যের মুহূর্তটা হয়তো আমরা হারিয়েছি। কিন্তু তাদের গণতান্ত্রিক চেতনা হারিয়ে যায়নি। এখন আত্মসমালোচনার সময় এসেছে—ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক নেতাদের ভাবা উচিত, তাঁরা কি জুলাইয়ের বিপ্লবী জনগণকে ব্যর্থ করেছেন?”
তিনি বলেন, গত এক বছরে ‘জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা’ হয়েছে—
“সংকট এখনো আছে, বরং আরও সংকট সামনে আসছে। সবাই সেটা অনুভব করছেন। ধীরে ধীরে জুলাইয়ের চেতনা আড়ালে চলে যাচ্ছে।”
“আংশিক সফলতাও গুরুত্বপূর্ণ”
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন—
“অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, জুলাই অভ্যুত্থানে কী অর্জন হলো? একটা বড় অর্জন হলো—এখনো আমরা মুক্তভাবে কথা বলতে পারি। ভুল হতেই পারে, কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নিলে বড় বিপদ এড়ানো যায়।”
তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের স্বপ্ন এখনো পূর্ণ হয়নি; শক্তিশালী আর্থসামাজিক ভিত্তি না থাকায় সংস্কার প্রক্রিয়া কঠিন।
“তবু যতটুকু সফলতা আসে, সেটাই আশার প্রতীক। আমাদের রাজনীতিবিদদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক—এই কামনা করি।”
তিনি আরও যোগ করেন—
“আমরা প্রায়ই বলি, সমাজে ‘মব কালচার’ শুরু হয়েছে। কিন্তু এরও একটি সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে যদি আবার ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসে, তবে জনগণের আরেকটি গণঅভ্যুত্থান অনিবার্য হবে।”
“কোনো বিপ্লবই পুরো সফল বা ব্যর্থ নয়”
লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন—
“এত মানুষ প্রাণ দিয়েছে—প্রতিটি প্রাণ একটি পরিবার, শুধু সংখ্যা নয়। কোনো বিপ্লবই পুরোপুরি ব্যর্থ হয় না, আবার পুরোপুরি সফলও হয় না। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও চীনের বিপ্লবের ইতিহাসে দেখা যায়, বিপ্লবের পর শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশে সে সংখ্যা অনেক কম। দয়া করে আমাকে হত্যার পক্ষে উৎসাহদাতা হিসেবে দেখবেন না।”
তিনি বলেন, গত এক বছরে বাংলাদেশে যা দেখা গেছে, তা খুব উৎসাহজনক নয়।
“গণমাধ্যমে এখনো ফ্যাসিস্ট বয়ান দৃশ্যমান”
গবেষক সাইমুম পারভেজ বলেন—
“ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে অনেক গণমাধ্যমই ফ্যাসিবাদী বয়ান প্রচারে ভূমিকা রেখেছিল। তবু অনেক সাংবাদিক সেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।”
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ স্বাগত বক্তব্যে বলেন—
“সমাজ ও রাজনীতিতে এখনো জুলাইয়ের আগুন জ্বলছে, কিন্তু গণমাধ্যমে সেটিই সবচেয়ে অস্পষ্ট। জুলাই গণহত্যার সমর্থকদের এখনো মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে।”
সভায় সভাপতিত্ব করেন পিআইবি পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম,
সঞ্চালনায় ছিলেন তথ্য ও গবেষণা কর্মকর্তা সহুল আহমেদ।
অনুষ্ঠানে ‘তারিখে জুলাই’, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবিতা’, ‘নিরীক্ষা: অভ্যুত্থান মিডিয়া বয়ান’, ‘যে সাংবাদিকদের হারিয়েছি’ এবং ‘ঘটনাপঞ্জি ২০২৪’—এই পাঁচটি প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
এছাড়া ‘বাংলা ফ্যাক্ট’ নামের একটি নতুন ফ্যাক্ট–চেকিং ওয়েবসাইট উদ্বোধন করে পিআইবি।






