যে যাই বলুক ভাই, মইনুলের সোনার হরিণ চাই
স্বৈরাচার হাসিনার নির্দেশেই সওজ ছাড়বেন না মইনুল?
- আপডেট সময় : 09:59:25 pm, Wednesday, 15 October 2025 550 বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডট
- বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, পর্ব-১
সওজ-এর ‘রাহুগ্রাস’: প্রধান প্রকৌশলী মাইনুল হাসানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ; ক্ষমতার উৎস নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ঢাকা: সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মাইনুল হাসানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ ও পোস্টিং বাণিজ্য, বিদেশে অর্থ পাচার, রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কর্মকাণ্ড এবং সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহারের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। দেশের শত শত সংবাদপত্র এবং প্রথম সারির পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেলে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তিনি এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। সরকারের উচ্চমহলের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রশ্রয় ও তার নিজস্ব ‘মাফিয়া কিং’ সুলভ ক্ষমতার জোরে তিনি সড়ক ও যোগাযোগ কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে তুলছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনে সওজের উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সর্বনিম্ন ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের পরও সড়ক প্রধানের পদে মাইনুল হাসানের বহাল থাকা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং তার ক্ষমতার উৎস নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। টিআইবি’র রিপোর্ট অনুযায়ী, সওজের উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজে সার্বিক দুর্নীতির হার ২৩-৪০ শতাংশ।
অভিযোগের ফিরিস্তি: দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার
সৈয়দ মাইনুল হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ ও গুরুতর:
নিয়োগ ও পোস্টিং বাণিজ্য: তার বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পোস্টিং বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। নিজের পছন্দের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করার ক্ষেত্রে তার ফিরিস্তি বিশাল। যেমন, ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পদে সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের পিএস-এর ভাগ্নী জামাই রিতেশ বড়ুয়াকে নিয়োগ, শেখ পরিবারের সদস্য লিটন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আব্দুল হামিদকে নরসিংদীর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ এবং মুন্সিগঞ্জের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিন রেজাকে ৫ আগস্টের পর মাস্টার্স করতে দক্ষিণ কোরিয়াতে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ: মাইনুল হাসানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ পাচার, বাড়ি কেনা এবং সন্তানদের আমেরিকায় পড়াশোনা করানোর মতো রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি বিদেশে পাচার করার পাঁয়তারা করছেন।
রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও পুনর্বাসন: তিনি পলাতক সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মাইনুল হাসান বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য ও আইইবি-২২ এর নির্বাচনে বিনা ভোটে সেন্ট্রাল কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনে। আওয়ামীপন্থীদের পুরস্কারস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে তিনি নতুন উপদেষ্টা-সচিবের চোখে ধুলো দিয়ে ‘সংস্কার’ কাজ চালিয়ে দিচ্ছেন।
বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লব: অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগের একটি বলয় তৈরি করে বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রতিবিপ্লব’ সংঘটনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে সরকার পতন হলেও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত মাইনুল হাসান বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও গুমের হুমকি: তিনি গণমাধ্যমবিরোধী এবং সড়ক ভবনে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে রেখেছেন। তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেন, “স্যারের হাত উত্তর পাড়ায় বেশ বিস্তৃত। স্যারকে নিয়ে নিউজ করলেই আবার গুম হতে হবে।”
সেতু ভবন উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র: শোনা যাচ্ছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সেতু ভবনকে উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি।
দুদকের তদন্ত ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা
বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, সেই তদন্ত ধীরগতি করতে তিনি অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাইনুল হাসানকে দ্রুত গ্রেফতার করে অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত না করতে পারলে যেকোনো সময় তিনি বিদেশে পাচার কিংবা বেনামে সরিয়ে ফেলতে পারেন। ৫ আগস্টের পর ট্রেইনিং ও উচ্চশিক্ষার নামে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের অনুমোদনের মাধ্যমে শেখ পরিবার ও ওবায়দুল কাদেরের বিপুল অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, যার সঙ্গে মাইনুল হাসান সরাসরি জড়িত ছিলেন।
পারিবারিক রাজনৈতিক ও আর্থিক দাপট
সৈয়দ মাইনুল হাসানের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার আপন চাচাতো ভাই শামসুল আলম কচি মল্লিকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবং নড়াইল জেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্য, যিনি জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ভোট দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় কিনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। মাইনুল হাসানের ভাগ্নে সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ মুনতাসির হাফিজ সড়ক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির আওয়ামী প্যানেলের দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি। অভিযোগ, বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেনের মূল দায়িত্বে ছিলেন মুনতাসির। বিরোধী মতাদর্শের মধ্যমসারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শায়েস্তা করা হতো তার ছক অনুযায়ী। ঢাকা সড়ক জোন পরিণত হয় ‘মামা-ভাগ্নে জোনে’।
নড়াইল জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এস. এম. ফেরদৌস রহমান জানিয়েছেন, মাইনুলের পুরো পরিবার এলাকায় সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। একই ইউনিয়নের (মল্লিকপুর) বিএনপির সভাপতি মো. খিজির আহমেদ বলেন, “এখানে আওয়ামী রাজনীতির মূল অর্থদাতাই সড়কের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল হাসান।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া
যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মাইনুল হাসানের মতো ব্যক্তির বহাল তবিয়তে থাকাকে দেশের গোটা যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশিষ্ট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “টিআইবি’র রিপোর্টে যে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে, তার মূল হোতাদের একজন হলেন মাইনুল হাসান। দেশের যোগাযোগ কাঠামোকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে তিনি যেন একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ‘অশান্ত অতৃপ্ত আত্মাকে প্রশান্তি’ দিচ্ছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে গ্রেফতার না করাটা প্রমাণ করে যে, তিনি এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী কোনো অদৃশ্য ছাতার তলে আছেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের পরিবর্তনের পরও যদি ফ্যাসিস্ট সরকারের চিহ্নিত দোসররা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন এবং আওয়ামী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তবে বর্তমান বিপ্লবী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। মাইনুল হাসানকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে তার অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং তার ক্ষমতার উৎস উন্মোচন করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।









