ঢাকা 10:08 pm, Tuesday, 28 July 2026

সওজে ফ্যাসিবাদী চক্রের পুনরুত্থান, মইনুল কে রক্ষা করছে ম্যাক আজাদ-জিকরুল-তারেক ইকবালের ত্রিশূলচক্র

সওজে ফ্যাসিবাদী চক্রের পুনরুত্থান (পর্ব-১)

রিফাত মৃধাঃ
  • আপডেট সময় : 09:56:04 pm, Wednesday, 19 November 2025 721 বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) যেন এক ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও সওজ-এ এখনো সাবেক সরকারের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের অধিকাংশ দপ্তরে সংস্কারের মৃদু আঁচ লাগলেও সড়ক বিভাগে তার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান-এর নেতৃত্বে এক তিন-স্তরবিশিষ্ট সিন্ডিকেট চক্র আওয়ামী বলয়ে থেকে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। এই চক্রের মূল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসানকে, যিনি একসময় স্বৈরাচারী শাসনের “সবচেয়ে শক্তিশালী দোসর” হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

মঈনুল হাসান: দুর্নীতির প্রধান স্থপতি ও তাঁর সিন্ডিকেট

সওজ প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান-এর বিরুদ্ধে তাঁর সহকর্মীরাই “গন্ডারের চামড়ার চেয়েও মোটা চামড়া”-র অধিকারী হওয়ার অভিযোগ করে থাকেন। শত অভিযোগের তথ্য প্রমান থাকলেও তার কোন অনুশোচনা নাই! দূর্নীতিবাজ ফ্যাসিস্ট এ প্রকৌশলী যেন তার চেয়ার কে সাথে নিয়েই ঘুড়েন। শতাধিক সংবাদমাধ্যমে তথ্য-প্রমাণসহ তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সড়ক উপদেষ্টার বিশেষ সুনজরে থাকার কারণে তিনি অপ্রতিরোধ্য থেকেছেন। মঈনুল হাসানকে টিকিয়ে রাখতে সড়কের চার থেকে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একজোট হয়ে কাজ করে চলেছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, তথাকথিত বিএনপি-পন্থী ও আওয়ামী-পন্থী প্রকৌশলীরা ফ্যাসিবাদের দোসর মঈনুলকে সুবিধা দিতে যেন একজোট হয়েছেন।

 

মঈনুলের সুবিধাভোগী চক্র

মঈনুল হাসানকে রক্ষা ও তাঁর দুর্নীতিতে সহযোগিতা প্রদানকারী হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন:

★আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল (অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী – কুমিল্লা বিভাগ), যিনি বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদের কাছের লোক হিসেবে পরিচয় দেন।

★অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আউয়াল।

★বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতৃত্বাধীন আরো কয়েকজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।

ম্যাক আজাদ (মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) – দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড খ্যাত।

★জাহাঙ্গীর আলম (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী- প্রশাসন)।

★জিকরুল আহসান (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), গোপালগঞ্জ সড়ক সার্কেল।

এই চক্র, বিশেষ করে ম্যাক আজাদ, জাহাঙ্গীর আলম, ও জিকরুল আহসান, গোটা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে গ্রাস করে ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সৎ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা

অন্যদিকে, মঈনুল-জিকরুল-তারেক ইকবাল গং-এর বিরুদ্ধে বিএনপি-পন্থী অতিরিক্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তাদের লক্ষ্য হলো সড়ক ভবনে একক রাজত্ব কায়েম করা। এবং মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের কোণঠাসা করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের রাজত্ব অব্যাহত রাখা। তাদের কূট কৌশলে বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে সওজে’র একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই অপপ্রচারে ইন্ধন যোগাচ্ছেন ওবায়দুল কাদেরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ একজন সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, যিনি বিগত সময়ে ঢাকা সড়ক বিভাগকে নিজের ‘মামা বাড়ির সম্পদ’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মঈনুল তাঁর পছন্দের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে ঢাকা সার্কেলে বসানোর জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন এবং সৎ প্রকৌশলীদের বিভিন্ন আন্ডাগ্রা১উন্ড গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে হেনস্তা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিজ দুর্নীতিকে আড়াল করতে প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসান সড়ক ভবনে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করে রেখেছেন।

সিন্ডিকেটের কার্যক্রম: বদলি বাণিজ্য ও অর্থ পাচার

সওজ সিন্ডিকেট চক্রের অধীনে সক্রিয় রয়েছে বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট এবং অর্থ পাচার সিন্ডিকেট। অভিযোগ মতে, ৫ আগস্টের পর ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিয়ে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও তাঁর পরিবারের কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই কর্মকর্তারা গত সাড়ে পনেরো বছর ধরে সড়কে ‘কাদের চক্র’ গড়ে তুলেছিলেন।

🔴 প্রকৌশলী সমিতি ভাঙনের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনাঃ

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই চক্রের একটি ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকৌশলী সমিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙ্গন সৃষ্টির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে থাকা শক্তি নিশ্চিহ্ন করে নতুন প্রকৌশলী সমিতি গঠন করে ফ্যাসিবাদের দোষরদের সেখানে পুনঃস্থাপন করা। ঠিকাদার সংকট দেখিয়ে রাস্তাঘাট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জনদুর্ভোগ তৈরি করার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান।

মঈনুলের রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সংযোগ

সৈয়দ মঈনুল হাসান ছিলেন সেন্ট্রাল বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের চলমান সদস্য। তিনি আইইবি (২০২২-২৩) নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (সবুর-মঞ্জুর প্যানেল) থেকে শেখ হাসিনার মতো বিনাভোটে নির্বাচন করে কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে গঠিত সড়ক কমিটির উপদেষ্ঠা পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং একসময় বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর চাচাতো ভাই শামসুল আলম কচি মল্লিকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবং নড়াইল জেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্য।

মঈনুল হাসানের ভাগ্নে সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ মুনতাসির হাফিজ সড়ক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির আওয়ামী প্যানেলের দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি।

nepotism ও ‘মামা-ভাগ্নে জোন

অভিযোগ রয়েছে, সড়কের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যই মঈনুল তাঁর ভাগ্নে মুনতাসীর-এর উত্থানে বিশেষ হস্তক্ষেপ করেন। মধ্যম সারির যেকোনো কর্মকর্তার পদায়ন বা বদলিতে মঈনুলের ভাগ্নে মুনতাসীরের আশীর্বাদপুষ্ট হতে হতো। বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেনের মূল দায়িত্বে থাকতেন মুনতাসির।

মুনতাসির চক্রের দৌরাত্ম্য

বদলি-পদায়নের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পরবর্তীতে জমা দেওয়া হতো অর্থ সংগ্রাহক সিন্ডিকেট প্রধানের হাতে। বিরোধী মতাদর্শের মধ্যমসারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শায়েস্তা করতে মুনতাসিরের ছক অনুযায়ী ওএসডি (Officer on Special Duty) কিংবা শাস্তিমূলক বদলি করা হতো। এ কাজে তাঁর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল: তৎকালীন আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট প্রশাসন ও সংস্থাপনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আমানউল্লাহ্।

ডিপ্লোমা সমিতির সদ্য বিদায়ী সেক্রেটারি মো. মনিরুল আলম।

তাদের একক দৌরাত্ম্যে ঢাকা সড়ক জোন পরিণত হয় ‘মামা-ভাগ্নে জোন’-এ। প্রধান প্রকৌশলী মঈনুলের তত্ত্বাবধানে ডিপ্লোমা সমিতির ব্যানারে চলত লোক দেখানো দুস্থদের মাঝে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের নামে দেশব্যাপী শেখ হাসিনা বন্দনা।

সেতু ভবনে আগুন: ওবায়দুল কাদের ও মঈনুলের যোগসাজশ

একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, ৫ আগস্টের আগে মহাখালীর সেতু ভবন, ঢাকা সড়ক বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাসহ বিভিন্ন স্থাপনা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজে। তিনি এই কাজে সহযোগিতা নেন সড়ক ভবনের ‘কাদের সিন্ডিকেট’ সদস্যদের। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগ স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।এই নাশকতার পুরো অর্থায়নই করেন মঈনুল হাসান।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাত্রলীগ নাশকতা চালালেও সেতু ভবনের ৫০ মিটার রেডিয়াসের মধ্যে অবস্থিত মঈনুল হাসানের সরকারি বাসভবনটি ছিল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। তখন পালা করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাঁর বাসভবন পাহারা দিত।

মঈনুলের পুনর্বাসন নীতি ও বিতর্কিত পদায়ন

প্রধান প্রকৌশলী মঈনুলের বিরুদ্ধে আওয়ামী-পন্থীদের পুনর্বাসন ও পদায়নের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নতুত্বের সুযোগ নিয়ে সংস্কারের কথা বলে তিনি আওয়ামী-পন্থী কর্মকর্তাদের পদায়ন করছেন।

বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা

মঈনুল হাসান নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসভবনে কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই ঠিকাদার ও ঢাকা সড়ক বিভাগের সদ্যবিদায়ী আওয়ামী-পন্থী নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্যার কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকার আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র কাজ করান। পুরস্কার হিসাবে নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্যাহকে প্রধান প্রকৌশলী মঈনের একক হস্তক্ষেপে গত ৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগে পদায়ন করা হয়। আহাদ উল্যার স্থানে স্থলাভিষিক্ত করা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের পিএস অশোক বাবুর ভাগ্নী জামাই রিতেশ বড়ুয়াকে।

এই রিতেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে পূর্বে কিশোরগঞ্জে প্রায় সকল সেতুতে লোহার পাতের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার প্রমাণসহ প্রতিবেদন এসেছিলো। এই খবর দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও মঈনুল হাসান (তৎকালীন ময়মনসিংহ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।

ম্যাক আজাদের পুনর্বাসন

৫ আগস্টের পর মঈনুলের নানা অপকর্মের হোতা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ ওরফে ম্যাক আজাদকে অপসারণের ব্যাপক দাবি উঠলে, উল্টো তাকে গত ৮ সেপ্টেম্বর লোক দেখানো প্রকিউরমেন্ট সার্কেল থেকে সরিয়ে দিয়ে আরো বড় দায়িত্ব সড়ক গবেষণাগারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। এই ম্যাক আজাদ ছিলেন সড়ক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের অর্থ সংগ্রাহক।

ভারতের সুবিধাভোগী নাজমুল হুদা: বিদেশ-পন্থী নীতি

সওজ সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নাজমুল হুদা-কে ‘ভারতের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বাংলাদেশের সড়ক খাতে ভারতের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দিতে দ্বিধা করেননি। আওয়ামী লীগ আমলের প্রতিষ্ঠিত এই কর্মকর্তাকে ঢাকা অফিসে সিলেট তামাবিল প্রজেক্ট অফিস বানিয়ে দিয়েছেন মঈনুল হাসান।

পরীক্ষিত দোসরদের আত্মত্যাগ

দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত আরেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসলামুল হক যেন হাসিনার পরীক্ষিত দোসর মঈনুলকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই চিত্র প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির এই সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী ও সুসংগঠিত।

⚖️ সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর সহযোগীরা এখনও সক্রিয়

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও কয়েকমাস কারাবাস করা সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মনির পাঠান-এর দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তকালীন সময়েও অর্থ সংগ্রাহক ও তাঁর ব্যাপক দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে ম্যাক আজাদের নাম আসে। ম্যাক আজাদকে দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদান করতে বলা হলেও তিনি হাজির হননি।

তৎকালীন ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক সচিব ও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল (তৎকালীন রক্ষণাবেক্ষণের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) সহ গোপালগঞ্জ সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জিকরুল হাসান দুদক চেয়ারম্যানের সাথে সরাসরি দেখা করে উল্টো দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অপসারণের জন্য চাপ দেন।

ম্যাক আজাদ সহ এই সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যরা হলেন:

ইসকন নেতা কুষ্টিয়া সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বিকাশ চন্দ্র দাস। স্বপন কুমার মৃধা, গুঞ্জন বড়ুয়া, শিশির কান্তি রাউত, জামাল উদ্দিন, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার চক্রবর্ত্তী।ইসকন সদস্য সাবেক পাবনা সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সমীরণ রায়।

ওবায়দুল কাদেরের দীর্ঘদিনের সহচর নোয়াখালী সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রানাপ্রিয় বড়ুয়া।

প্রধান প্রকৌশলীর বন্ধু অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন।

এই তালিকা এটাই প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মনির পাঠান জেলে গেলেও তাঁর সহযোগীরা সড়কে এখনো সক্রিয়।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরেও এই চক্রের অপ্রতিহত প্রভাব এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম অব্যাহত থাকা দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বদলি বাণিজ্য, অর্থ পাচার, স্বজনপ্রীতি, এবং বিতর্কিত পদায়নের মাধ্যমে তারা গোটা সওজ অধিদপ্তরকে গ্রাস করে ফেলেছে বলে প্রতীয়মান হয়। অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিয়ে সওজ-এ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। সওজ প্রকৌশলীদের ক্রমবর্ধমান অনিয়ম ও মইনূলের সালতামামি দেখতে চোখ রাখুন ধারাবাহিক প্রতিবেদন এর ২য় পর্বে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সওজে ফ্যাসিবাদী চক্রের পুনরুত্থান, মইনুল কে রক্ষা করছে ম্যাক আজাদ-জিকরুল-তারেক ইকবালের ত্রিশূলচক্র

সওজে ফ্যাসিবাদী চক্রের পুনরুত্থান (পর্ব-১)

আপডেট সময় : 09:56:04 pm, Wednesday, 19 November 2025

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) যেন এক ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও সওজ-এ এখনো সাবেক সরকারের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সক্রিয়তা অব্যাহত রয়েছে। সরকারের অধিকাংশ দপ্তরে সংস্কারের মৃদু আঁচ লাগলেও সড়ক বিভাগে তার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান-এর নেতৃত্বে এক তিন-স্তরবিশিষ্ট সিন্ডিকেট চক্র আওয়ামী বলয়ে থেকে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। এই চক্রের মূল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসানকে, যিনি একসময় স্বৈরাচারী শাসনের “সবচেয়ে শক্তিশালী দোসর” হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

মঈনুল হাসান: দুর্নীতির প্রধান স্থপতি ও তাঁর সিন্ডিকেট

সওজ প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান-এর বিরুদ্ধে তাঁর সহকর্মীরাই “গন্ডারের চামড়ার চেয়েও মোটা চামড়া”-র অধিকারী হওয়ার অভিযোগ করে থাকেন। শত অভিযোগের তথ্য প্রমান থাকলেও তার কোন অনুশোচনা নাই! দূর্নীতিবাজ ফ্যাসিস্ট এ প্রকৌশলী যেন তার চেয়ার কে সাথে নিয়েই ঘুড়েন। শতাধিক সংবাদমাধ্যমে তথ্য-প্রমাণসহ তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সড়ক উপদেষ্টার বিশেষ সুনজরে থাকার কারণে তিনি অপ্রতিরোধ্য থেকেছেন। মঈনুল হাসানকে টিকিয়ে রাখতে সড়কের চার থেকে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একজোট হয়ে কাজ করে চলেছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, তথাকথিত বিএনপি-পন্থী ও আওয়ামী-পন্থী প্রকৌশলীরা ফ্যাসিবাদের দোসর মঈনুলকে সুবিধা দিতে যেন একজোট হয়েছেন।

 

মঈনুলের সুবিধাভোগী চক্র

মঈনুল হাসানকে রক্ষা ও তাঁর দুর্নীতিতে সহযোগিতা প্রদানকারী হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন:

★আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল (অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী – কুমিল্লা বিভাগ), যিনি বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদের কাছের লোক হিসেবে পরিচয় দেন।

★অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আউয়াল।

★বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতৃত্বাধীন আরো কয়েকজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।

ম্যাক আজাদ (মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) – দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড খ্যাত।

★জাহাঙ্গীর আলম (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী- প্রশাসন)।

★জিকরুল আহসান (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), গোপালগঞ্জ সড়ক সার্কেল।

এই চক্র, বিশেষ করে ম্যাক আজাদ, জাহাঙ্গীর আলম, ও জিকরুল আহসান, গোটা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে গ্রাস করে ফেলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সৎ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা

অন্যদিকে, মঈনুল-জিকরুল-তারেক ইকবাল গং-এর বিরুদ্ধে বিএনপি-পন্থী অতিরিক্ত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। তাদের লক্ষ্য হলো সড়ক ভবনে একক রাজত্ব কায়েম করা। এবং মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের কোণঠাসা করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের রাজত্ব অব্যাহত রাখা। তাদের কূট কৌশলে বিএনপিপন্থী প্রকৌশলীদের মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে সওজে’র একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই অপপ্রচারে ইন্ধন যোগাচ্ছেন ওবায়দুল কাদেরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ একজন সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, যিনি বিগত সময়ে ঢাকা সড়ক বিভাগকে নিজের ‘মামা বাড়ির সম্পদ’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মঈনুল তাঁর পছন্দের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে ঢাকা সার্কেলে বসানোর জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন এবং সৎ প্রকৌশলীদের বিভিন্ন আন্ডাগ্রা১উন্ড গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে হেনস্তা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নিজ দুর্নীতিকে আড়াল করতে প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল হাসান সড়ক ভবনে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করে রেখেছেন।

সিন্ডিকেটের কার্যক্রম: বদলি বাণিজ্য ও অর্থ পাচার

সওজ সিন্ডিকেট চক্রের অধীনে সক্রিয় রয়েছে বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট এবং অর্থ পাচার সিন্ডিকেট। অভিযোগ মতে, ৫ আগস্টের পর ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিয়ে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও তাঁর পরিবারের কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই কর্মকর্তারা গত সাড়ে পনেরো বছর ধরে সড়কে ‘কাদের চক্র’ গড়ে তুলেছিলেন।

🔴 প্রকৌশলী সমিতি ভাঙনের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনাঃ

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই চক্রের একটি ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকৌশলী সমিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙ্গন সৃষ্টির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে থাকা শক্তি নিশ্চিহ্ন করে নতুন প্রকৌশলী সমিতি গঠন করে ফ্যাসিবাদের দোষরদের সেখানে পুনঃস্থাপন করা। ঠিকাদার সংকট দেখিয়ে রাস্তাঘাট মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে কৃত্রিম অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জনদুর্ভোগ তৈরি করার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান।

মঈনুলের রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সংযোগ

সৈয়দ মঈনুল হাসান ছিলেন সেন্ট্রাল বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের চলমান সদস্য। তিনি আইইবি (২০২২-২৩) নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (সবুর-মঞ্জুর প্যানেল) থেকে শেখ হাসিনার মতো বিনাভোটে নির্বাচন করে কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে গঠিত সড়ক কমিটির উপদেষ্ঠা পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং একসময় বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর চাচাতো ভাই শামসুল আলম কচি মল্লিকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবং নড়াইল জেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্য।

মঈনুল হাসানের ভাগ্নে সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ মুনতাসির হাফিজ সড়ক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির আওয়ামী প্যানেলের দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি।

nepotism ও ‘মামা-ভাগ্নে জোন

অভিযোগ রয়েছে, সড়কের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যই মঈনুল তাঁর ভাগ্নে মুনতাসীর-এর উত্থানে বিশেষ হস্তক্ষেপ করেন। মধ্যম সারির যেকোনো কর্মকর্তার পদায়ন বা বদলিতে মঈনুলের ভাগ্নে মুনতাসীরের আশীর্বাদপুষ্ট হতে হতো। বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেনের মূল দায়িত্বে থাকতেন মুনতাসির।

মুনতাসির চক্রের দৌরাত্ম্য

বদলি-পদায়নের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পরবর্তীতে জমা দেওয়া হতো অর্থ সংগ্রাহক সিন্ডিকেট প্রধানের হাতে। বিরোধী মতাদর্শের মধ্যমসারির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শায়েস্তা করতে মুনতাসিরের ছক অনুযায়ী ওএসডি (Officer on Special Duty) কিংবা শাস্তিমূলক বদলি করা হতো। এ কাজে তাঁর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল: তৎকালীন আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট প্রশাসন ও সংস্থাপনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আমানউল্লাহ্।

ডিপ্লোমা সমিতির সদ্য বিদায়ী সেক্রেটারি মো. মনিরুল আলম।

তাদের একক দৌরাত্ম্যে ঢাকা সড়ক জোন পরিণত হয় ‘মামা-ভাগ্নে জোন’-এ। প্রধান প্রকৌশলী মঈনুলের তত্ত্বাবধানে ডিপ্লোমা সমিতির ব্যানারে চলত লোক দেখানো দুস্থদের মাঝে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণের নামে দেশব্যাপী শেখ হাসিনা বন্দনা।

সেতু ভবনে আগুন: ওবায়দুল কাদের ও মঈনুলের যোগসাজশ

একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, ৫ আগস্টের আগে মহাখালীর সেতু ভবন, ঢাকা সড়ক বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাসহ বিভিন্ন স্থাপনা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজে। তিনি এই কাজে সহযোগিতা নেন সড়ক ভবনের ‘কাদের সিন্ডিকেট’ সদস্যদের। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগ স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।এই নাশকতার পুরো অর্থায়নই করেন মঈনুল হাসান।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাত্রলীগ নাশকতা চালালেও সেতু ভবনের ৫০ মিটার রেডিয়াসের মধ্যে অবস্থিত মঈনুল হাসানের সরকারি বাসভবনটি ছিল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। তখন পালা করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাঁর বাসভবন পাহারা দিত।

মঈনুলের পুনর্বাসন নীতি ও বিতর্কিত পদায়ন

প্রধান প্রকৌশলী মঈনুলের বিরুদ্ধে আওয়ামী-পন্থীদের পুনর্বাসন ও পদায়নের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নতুত্বের সুযোগ নিয়ে সংস্কারের কথা বলে তিনি আওয়ামী-পন্থী কর্মকর্তাদের পদায়ন করছেন।

বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা

মঈনুল হাসান নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসভবনে কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই ঠিকাদার ও ঢাকা সড়ক বিভাগের সদ্যবিদায়ী আওয়ামী-পন্থী নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্যার কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকার আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র কাজ করান। পুরস্কার হিসাবে নির্বাহী প্রকৌশলী আহাদ উল্যাহকে প্রধান প্রকৌশলী মঈনের একক হস্তক্ষেপে গত ৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগে পদায়ন করা হয়। আহাদ উল্যার স্থানে স্থলাভিষিক্ত করা হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের পিএস অশোক বাবুর ভাগ্নী জামাই রিতেশ বড়ুয়াকে।

এই রিতেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে পূর্বে কিশোরগঞ্জে প্রায় সকল সেতুতে লোহার পাতের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার প্রমাণসহ প্রতিবেদন এসেছিলো। এই খবর দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও মঈনুল হাসান (তৎকালীন ময়মনসিংহ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।

ম্যাক আজাদের পুনর্বাসন

৫ আগস্টের পর মঈনুলের নানা অপকর্মের হোতা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ ওরফে ম্যাক আজাদকে অপসারণের ব্যাপক দাবি উঠলে, উল্টো তাকে গত ৮ সেপ্টেম্বর লোক দেখানো প্রকিউরমেন্ট সার্কেল থেকে সরিয়ে দিয়ে আরো বড় দায়িত্ব সড়ক গবেষণাগারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। এই ম্যাক আজাদ ছিলেন সড়ক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্নীতি ও বদলি বাণিজ্যের অর্থ সংগ্রাহক।

ভারতের সুবিধাভোগী নাজমুল হুদা: বিদেশ-পন্থী নীতি

সওজ সিলেট জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নাজমুল হুদা-কে ‘ভারতের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বাংলাদেশের সড়ক খাতে ভারতের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দিতে দ্বিধা করেননি। আওয়ামী লীগ আমলের প্রতিষ্ঠিত এই কর্মকর্তাকে ঢাকা অফিসে সিলেট তামাবিল প্রজেক্ট অফিস বানিয়ে দিয়েছেন মঈনুল হাসান।

পরীক্ষিত দোসরদের আত্মত্যাগ

দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত আরেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসলামুল হক যেন হাসিনার পরীক্ষিত দোসর মঈনুলকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই চিত্র প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির এই সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী ও সুসংগঠিত।

⚖️ সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর সহযোগীরা এখনও সক্রিয়

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও কয়েকমাস কারাবাস করা সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মনির পাঠান-এর দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তকালীন সময়েও অর্থ সংগ্রাহক ও তাঁর ব্যাপক দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে ম্যাক আজাদের নাম আসে। ম্যাক আজাদকে দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদান করতে বলা হলেও তিনি হাজির হননি।

তৎকালীন ওবায়দুল কাদেরের রাজনৈতিক সচিব ও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল (তৎকালীন রক্ষণাবেক্ষণের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) সহ গোপালগঞ্জ সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জিকরুল হাসান দুদক চেয়ারম্যানের সাথে সরাসরি দেখা করে উল্টো দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অপসারণের জন্য চাপ দেন।

ম্যাক আজাদ সহ এই সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যরা হলেন:

ইসকন নেতা কুষ্টিয়া সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বিকাশ চন্দ্র দাস। স্বপন কুমার মৃধা, গুঞ্জন বড়ুয়া, শিশির কান্তি রাউত, জামাল উদ্দিন, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার চক্রবর্ত্তী।ইসকন সদস্য সাবেক পাবনা সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সমীরণ রায়।

ওবায়দুল কাদেরের দীর্ঘদিনের সহচর নোয়াখালী সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রানাপ্রিয় বড়ুয়া।

প্রধান প্রকৌশলীর বন্ধু অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন।

এই তালিকা এটাই প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির দায়ে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মনির পাঠান জেলে গেলেও তাঁর সহযোগীরা সড়কে এখনো সক্রিয়।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরেও এই চক্রের অপ্রতিহত প্রভাব এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম অব্যাহত থাকা দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বদলি বাণিজ্য, অর্থ পাচার, স্বজনপ্রীতি, এবং বিতর্কিত পদায়নের মাধ্যমে তারা গোটা সওজ অধিদপ্তরকে গ্রাস করে ফেলেছে বলে প্রতীয়মান হয়। অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিয়ে সওজ-এ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। সওজ প্রকৌশলীদের ক্রমবর্ধমান অনিয়ম ও মইনূলের সালতামামি দেখতে চোখ রাখুন ধারাবাহিক প্রতিবেদন এর ২য় পর্বে।