ঢাকা 11:54 pm, Wednesday, 29 July 2026

বাবুবাজারে শর্ত ভেঙে দোকান, মাসে উঠছে প্রায় ৩০ লাখ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : 02:33:05 pm, Tuesday, 25 November 2025 399 বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পুরান ঢাকার দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু, অর্থাৎ বাবুবাজার ব্রিজের নিচের নির্দিষ্ট জায়গাটি মূলত শুধু গাড়ি পার্ক করার উদ্দেশ্যে বছরে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ইজারাচুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা ছিল—হকার বসানো যাবে না এবং পার্কিং ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা চালানো হলে ইজারা বাতিল করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গাটি এখন ধীরে ধীরে বড় ধরনের ব্যবসার কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল মান্নানের প্রভাবে সেখানে দোকানপাট বসানো হয়েছে। তাঁর অনুসারীরাই এসব দোকান ও পার্কিং থেকে টাকা তোলেন, যা মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো হয় বলে জানা যায়। এমনকি সংগৃহীত টাকার একটি অংশ পুলিশকেও দেওয়া হয়—এমন কথাও শোনা যায়।

সেতুর নিচের এই সড়কটি মিটফোর্ড হাসপাতাল, ইসলামপুর, বাদামতলী, চকবাজার ও সদরঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাতায়ের অন্যতম পথ। সড়ক ও ফুটপাত দখল হওয়ায় এ এলাকায় নিয়মিতই তীব্র যানজট দেখা দেয়।

সেতুর নয়টি ব্লকের নিচে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দোকান—প্রায় ৮০টি মাস্কের দোকান, ২৫টি ফলের দোকান, ২৪টি কাপড়ের দোকান, কয়েকটি খাবারের হোটেল, চায়ের দোকান, পুরোনো মোবাইলের দোকান, এমনকি ভ্যান ও রিকশার গ্যারেজও রয়েছে।

সেদিন সকালে মিটফোর্ড হাসপাতালে যেতে গিয়ে ধানমন্ডির এক বাসিন্দা সেতুর নিচে আধা ঘণ্টার বেশি যানজটে আটকে ছিলেন। তিনি জানান, দোকানপাট বসিয়ে রাস্তা সরু হয়ে গেছে এবং অনেকেই রাস্তার ওপরেই মালামাল উঠানো–নামানো করায় যানজট আরও বেড়ে যায়।

ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, ২৮ হাজার বর্গফুট জায়গার ইজারা বাবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তির কাছে বছরে ৭৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় দেওয়া হয়েছিল। ভ্যাট ও করসহ আরও অতিরিক্ত অর্থ তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে।

বিভিন্ন দোকান থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া তোলা হয়। কয়েকটি পরিবহন সংস্থা জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য হন। অথচ সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত পার্কিং ফি অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার জন্য একটি গাড়ির সর্বোচ্চ চার্জ ২৫০ টাকা হওয়ার কথা।

যদিও ইজারায় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্কিংয়ের অনুমতি ছিল, বাস্তবে জায়গাটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ভাড়ায় ব্যবহৃত হয়।

দোকান, ভ্যান–রিকশার গ্যারেজ, পণ্য ওঠানো–নামানোসহ সব মিলিয়ে প্রতিদিন দুই লাখ টাকার বেশি ওঠে। এর মধ্যে ইজারাদার নিজের কাছে প্রায় এক লাখ টাকা রেখে বাকি অংশ বিভিন্ন জনের মধ্যে ভাগ করে দেন বলে জানা যায়।

স্থানীয় দোকানি ও ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের মতে, ইজারা বাবুল হোসেনের নামে হলেও আসল বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছে কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে।

তবে বাবুল হোসেন দাবি করেছেন—কাউন্সিলর সরাসরি জড়িত নন। তাঁর পরিচিত কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইজারা নিয়েছেন। এছাড়া সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদেরও নাকি বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, যানজট কমানোর দিক বিবেচনা করেই তারা ব্যবসা পরিচালনা করার চেষ্টা করেন।

বিষয়টি নিয়ে কাউন্সিলর আবদুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বা বার্তার জবাব দেননি।

ডিএসসিসির দুই কর্মকর্তা জানান, দুই বছর আগে একই জায়গার ইজারা ৩৬ লাখ টাকায় দেওয়া হয়েছিল। প্রতিযোগিতার কারণে এবার ইজারামূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে—ফলে বিনিয়োগ তোলার লক্ষ্যে ব্যবসার পরিধি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে।

ডিএসসিসির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ কঠোর থাকলে এ ধরনের বাণিজ্য টিকত না। তবে কোতোয়ালি থানার ওসি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পুলিশ কোনোভাবেই এতে জড়িত নয়।

ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ জানায়, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং এর আগেও বহুবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। প্রয়োজনে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

বাবুবাজারে শর্ত ভেঙে দোকান, মাসে উঠছে প্রায় ৩০ লাখ

আপডেট সময় : 02:33:05 pm, Tuesday, 25 November 2025

পুরান ঢাকার দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু, অর্থাৎ বাবুবাজার ব্রিজের নিচের নির্দিষ্ট জায়গাটি মূলত শুধু গাড়ি পার্ক করার উদ্দেশ্যে বছরে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ইজারাচুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা ছিল—হকার বসানো যাবে না এবং পার্কিং ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা চালানো হলে ইজারা বাতিল করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গাটি এখন ধীরে ধীরে বড় ধরনের ব্যবসার কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল মান্নানের প্রভাবে সেখানে দোকানপাট বসানো হয়েছে। তাঁর অনুসারীরাই এসব দোকান ও পার্কিং থেকে টাকা তোলেন, যা মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো হয় বলে জানা যায়। এমনকি সংগৃহীত টাকার একটি অংশ পুলিশকেও দেওয়া হয়—এমন কথাও শোনা যায়।

সেতুর নিচের এই সড়কটি মিটফোর্ড হাসপাতাল, ইসলামপুর, বাদামতলী, চকবাজার ও সদরঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাতায়ের অন্যতম পথ। সড়ক ও ফুটপাত দখল হওয়ায় এ এলাকায় নিয়মিতই তীব্র যানজট দেখা দেয়।

সেতুর নয়টি ব্লকের নিচে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দোকান—প্রায় ৮০টি মাস্কের দোকান, ২৫টি ফলের দোকান, ২৪টি কাপড়ের দোকান, কয়েকটি খাবারের হোটেল, চায়ের দোকান, পুরোনো মোবাইলের দোকান, এমনকি ভ্যান ও রিকশার গ্যারেজও রয়েছে।

সেদিন সকালে মিটফোর্ড হাসপাতালে যেতে গিয়ে ধানমন্ডির এক বাসিন্দা সেতুর নিচে আধা ঘণ্টার বেশি যানজটে আটকে ছিলেন। তিনি জানান, দোকানপাট বসিয়ে রাস্তা সরু হয়ে গেছে এবং অনেকেই রাস্তার ওপরেই মালামাল উঠানো–নামানো করায় যানজট আরও বেড়ে যায়।

ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, ২৮ হাজার বর্গফুট জায়গার ইজারা বাবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তির কাছে বছরে ৭৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় দেওয়া হয়েছিল। ভ্যাট ও করসহ আরও অতিরিক্ত অর্থ তাকে পরিশোধ করতে হয়েছে।

বিভিন্ন দোকান থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া তোলা হয়। কয়েকটি পরিবহন সংস্থা জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে বাধ্য হন। অথচ সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত পার্কিং ফি অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার জন্য একটি গাড়ির সর্বোচ্চ চার্জ ২৫০ টাকা হওয়ার কথা।

যদিও ইজারায় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্কিংয়ের অনুমতি ছিল, বাস্তবে জায়গাটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ভাড়ায় ব্যবহৃত হয়।

দোকান, ভ্যান–রিকশার গ্যারেজ, পণ্য ওঠানো–নামানোসহ সব মিলিয়ে প্রতিদিন দুই লাখ টাকার বেশি ওঠে। এর মধ্যে ইজারাদার নিজের কাছে প্রায় এক লাখ টাকা রেখে বাকি অংশ বিভিন্ন জনের মধ্যে ভাগ করে দেন বলে জানা যায়।

স্থানীয় দোকানি ও ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের মতে, ইজারা বাবুল হোসেনের নামে হলেও আসল বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছে কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে।

তবে বাবুল হোসেন দাবি করেছেন—কাউন্সিলর সরাসরি জড়িত নন। তাঁর পরিচিত কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইজারা নিয়েছেন। এছাড়া সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদেরও নাকি বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, যানজট কমানোর দিক বিবেচনা করেই তারা ব্যবসা পরিচালনা করার চেষ্টা করেন।

বিষয়টি নিয়ে কাউন্সিলর আবদুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বা বার্তার জবাব দেননি।

ডিএসসিসির দুই কর্মকর্তা জানান, দুই বছর আগে একই জায়গার ইজারা ৩৬ লাখ টাকায় দেওয়া হয়েছিল। প্রতিযোগিতার কারণে এবার ইজারামূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে—ফলে বিনিয়োগ তোলার লক্ষ্যে ব্যবসার পরিধি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে।

ডিএসসিসির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ কঠোর থাকলে এ ধরনের বাণিজ্য টিকত না। তবে কোতোয়ালি থানার ওসি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পুলিশ কোনোভাবেই এতে জড়িত নয়।

ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ জানায়, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং এর আগেও বহুবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। প্রয়োজনে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে।